শ্ৰীমন্ত শংকৰদেৱ কেৱল ধৰ্মগুৰু নাছিল — কবি, নাট্যকাৰ, সংগীতজ্ঞ, সমাজ সংস্কাৰক আৰু অসমীয়া ভাষাৰ শক্তিৰ উৎস।
শংকরদেব ১৪৪৯ খ্রিস্টাব্দে অসমের নগাঁও জেলার বরদোয়া অঞ্চলের আলিপুখুরি নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কুসুম্বর ভূঞা। শৈশবেই তিনি পিতামাতাকে হারান, তবু সেই শিশুর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ প্রতিভা। সেই সময় অসমে আধুনিক বিদ্যালয় বা সংবাদমাধ্যম ছিল না।
তিনি ছোটবেলা থেকেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন এবং জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ রাখতেন। পরে তাঁকে মহেন্দ্র কন্দলীর টোলে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি ব্যাকরণ শাস্ত্র, বেদান্ত, পুরাণ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করেন।
তিনি ভারতের বিভিন্ন পবিত্র স্থান ভ্রমণ করেন, তবে শুধু তীর্থ দর্শনের জন্য নয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরা, সমাজ, সংস্কৃতি ও ভক্তিধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। সাধু ও পণ্ডিতদের সঙ্গে মতবিনিময় তাঁর চিন্তাধারাকে বিস্তৃত করে, যার কেন্দ্রে ছিল শ্রীকৃষ্ণ বা বিষ্ণুর প্রতি একান্ত ভক্তি।
শংকরদেবের ধর্মীয় আন্দোলন পরে একশরণ নামধর্ম নামে পরিচিত হয়। এর অর্থ একান্তভাবে ঈশ্বরের শরণ নেওয়া। এই ভক্তির পথ খুব সহজ ছিল; এতে কোনো যজ্ঞ বা কঠিন আচার-অনুষ্ঠানের উপর নয়, আন্তরিক ভক্তিতে ঈশ্বরের নাম স্মরণ ও সৎ আচরণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নামঘর শুধু প্রার্থনার স্থান ছিল না, এটি সমাজের মিলনস্থলী হয়ে ওঠে। এখানে সকল মানুষ একত্র হয়ে নাম-কীর্তন করে, ভক্তিগীত গায়, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক বিষয় আলোচনা করে। এভাবে শংকরদেব ধর্ম ও সমাজজীবনের মধ্যে সেতু স্থাপন করেন, যা আজও গ্রামের কেন্দ্র।
তিনি কাব্য, নাটক, গীত ও ভক্তিমূলক পদ রচনা করেন এবং ভাগবতের বিভিন্ন অংশ সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন। কীর্তন ঘোষা অসমিয়া বৈষ্ণব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, যা নামঘরে গাওয়া ও পাঠ করা হয়। গুণমালা হলো সংক্ষিপ্ত ও সুললিত রচনা।
বরগীত শুধু গান নয়, এটি ভক্তির সুর ও ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণের সংগীতময় রূপ, যাতে শ্রীকৃষ্ণের রূপ, গুণ ও লীলা প্রকাশ পায়। ব্রজাবলী হলো এক সাহিত্যিক ভাষা, যা শংকরদেব ও পরবর্তী বৈষ্ণব সাহিত্যিকরা ভক্তিমূলক রচনা ও নাটকে ব্যবহার করেছিলেন।
শংকরদেব অংকীয়া নাট সৃষ্টি করেন, যার উদ্দেশ্য শুধু বিনোদন নয়। কালিয়দমন, পত্নীপ্রসাদ, কেলিগোপাল, পারিজাত হরণ, রুক্মিণী হরণ প্রভৃতি নাটক উল্লেখযোগ্য। অভিনয় পরম্পরা পরে ভাওনা নামে রূপ নেয়, যাতে সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, মুখা ও সাজপোশাক থাকে। চিহ্নযাত্রা তাঁর প্রাথমিক নাট্য প্রয়াস।
মাধবদেব প্রথমে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে দৃঢ় ছিলেন, কিন্তু শংকরদেবের সঙ্গে তর্ক ও আলোচনা তাঁর জীবনের দিক পরিবর্তন করে। এই গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক এক বৃহৎ সামাজিক আন্দোলনের শক্তি ছিল। শংকরদেব ভিত্তি স্থাপন করেন, মাধবদেব তাকে আরও বিস্তৃত রূপে এগিয়ে নেন।
প্রথম শিক্ষা নম্রতা, জ্ঞান লাভ করলে অহংকার ত্যাগ করতে হয়। দ্বিতীয় ভক্তি, আন্তরিক বিশ্বাস মনকে শক্তিশালী করে। তৃতীয় মানবতা, মানুষকে সম্মান করা। সংস্কৃতির মূল্য হলো গীত, নাট ও শিল্প সমাজ গড়ার মাধ্যম। পঞ্চম, বিভাজন নয়, মিলনেই সমাজের শক্তি।